ভালোবেসে অন্য জাতির (বর্ণের) ছেলেকে বিয়ে এবং বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে এক তরুণীকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে দিয়েছে তারই জন্মদাত্রী মা ও আপন ভাই। ভারতের বিহারের মুজাফফরপুর জেলায় এই বর্বরোচিত ‘অনার কিলিং’ বা সম্মান রক্ষার নামে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে। নিহত ওই হতভাগ্য তরুণীর নাম সুজাতা কুমারী (১৯)।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা গেছে, ২০২০ সালে মুজাফফরপুরের ঘনসাউত গ্রামের গৌরী শঙ্কর কুমার (২২) নামের এক যুবকের সঙ্গে সুজাতার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দীর্ঘ প্রেমের পর গত ১৮ জানুয়ারি তাঁরা বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেন এবং হরিয়ানায় গিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন। তবে সুজাতার পরিবার মেনে না নিয়ে থানায় একটি অপহরণের মামলা দায়ের করলে গত ১১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ তাঁদের আটক করে মুজাফফরপুরে ফিরিয়ে আনে। আদালতে সুজাতা নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করার জবানবন্দি দিলেও পুলিশ গৌরী শঙ্করকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয় এবং সুজাতাকে তাঁর এক খালার জিম্মায় রাখার নির্দেশ দেয়।
এরপরই সুজাতার পরিবার তাঁকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার নৃশংস পরিকল্পনা শুরু করে। গত মার্চ মাসে হোলি উৎসবের দিন সুজাতার মা কৌশলে খালাবাড়ি থেকে সুজাতাকে নিজেদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। কিছুদিন পর ৩১ মার্চ কারাগার থেকে মুক্তি পান গৌরী শঙ্কর। সেদিনই সুজাতার সঙ্গে তাঁর শেষবারের মতো মুঠোফোনে কথা হয়। এরপর থেকেই সুজাতা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান।
স্ত্রীর কোনো খোঁজ না পেয়ে এবং স্থানীয় পুলিশের কাছ থেকে আশানুরূপ সাহায্য না পেয়ে অবশেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন গৌরী শঙ্কর। ভিডিওতে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, সুজাতার পরিবার তাঁকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলেছে; পুলিশ ব্যবস্থা না নিলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হলে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বিষয়টি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তদন্ত দল দ্রুত সুজাতার ভাই অভিষেক কুমারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পুলিশের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে নিজের বোনকে নৃশংসভাবে হত্যার কথা স্বীকার করেন অভিষেক। অন্য জাতির ছেলের সঙ্গে বোনের পালিয়ে বিয়ে করাটা পরিবারের সামাজিক সম্মানে আঘাত লেগেছিল এবং তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি বলে জানান তিনি।
অভিষেক স্বীকার করেন, তাঁর মা সুজাতাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পর, তিনি ও তাঁর কয়েকজন আত্মীয় মিলে সুজাতাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এবং সমস্ত আইনি প্রমাণ মুছে ফেলতে ওই রাতেই তড়িঘড়ি করে সুজাতার মরদেহ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এই লোমহর্ষক ঘটনা ফাঁসের পর পুলিশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ঘাতক মা, ভাইসহ বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করেছে।