ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬ ()

বিশ্বকাপে ১ লাখ টাকা খরচ করবেন ভ্যানচালক বাংলার মেসি

Oplus_131072

ফুটবল বিশ্বকাপ এখনও শুরু হতে কিছুটা সময় বাকি; কিন্তু ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে যেন আগেভাগেই নেমে এসেছে বিশ্বকাপের উত্তাপ। পৌর শহরের একপ্রান্তে ছোট্ট একটি আশ্রয়ণ ঘরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনার ক্ষুদে দুর্গ। আর এর নেপথ্যের মানুষটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘মেসি সুমন’ নামে।

দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেও প্রিয় দল আর্জেন্টিনা এবং প্রিয় তারকা লিওনেল মেসিকে ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন সুমন গৌড়। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে স্ত্রীর নামে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, এবারের বিশ্বকাপ উপলক্ষে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনাও করেছেন এই আর্জেন্টিনা-ভক্ত।

সরেজমিন বুধবার (১০ জুন) দেখা যায়, ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভা থেকে রহমতগঞ্জ পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে উড়ছে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকা। স্থানীয়দের দাবি, এসব পতাকা টাঙানোর পুরো উদ্যোগই নিয়েছেন সুমন। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার টাকার বাঁশ কিনে বিপুলসংখ্যক পতাকা দিয়ে এলাকায় বিশ্বকাপের আবহ তৈরি করেছেন তিনি।

স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন শুধুই সুমন নন, ‘মেসি সুমন’। দিনমজুরি আর ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা এই মানুষটির সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। নিজের নামে এক টুকরো জমিও নেই। আশ্রয়ণ প্রকল্পে পাওয়া একটি ঘরই তার পরিবারের একমাত্র ঠিকানা। তবু বিশ্বকাপ এলেই যেন বদলে যায় তার জীবন।

সুমন বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ভালোবাসি। আমার পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক। মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, আমার আবেগের নাম। বিশ্বকাপ এলেই মনে হয় উৎসব চলে এসেছে।

তিনি জানান, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু করেছেন দুই মাস আগেই। নিজের ঘর, ভ্যান ও আশপাশের এলাকা আর্জেন্টিনার রঙে সাজানোর কাজ চলছে। ঘরের দেয়ালে লাগানোর জন্য পোস্টার, ব্যানার ও বিভিন্ন সাজসজ্জার সামগ্রীও তৈরি করছেন তিনি।

সুমনের স্ত্রী আরতি গৌড়ও স্বামীর মতোই আর্জেন্টিনা সমর্থক। তিনি বলেন, আমিও মেসির ভক্ত। সংসারে কষ্ট আছে, ঋণের চাপও আছে। তারপরও স্বামীর আনন্দে বাধা দিতে চাই না। বিশ্বকাপ এলে ও যেন অন্য এক জগতে চলে যায়।

কথা বলতে বলতে তার চোখেমুখে একদিকে যেমন ছিল স্বামীর প্রতি মমতা, অন্যদিকে ছিল সংসারের বাস্তবতার চাপ। তবু প্রিয় দলের প্রতি পরিবারের এই ভালোবাসা যেন সব হিসাব-নিকাশকে ছাপিয়ে গেছে।

প্রতিবেশীরা জানান, বিশ্বকাপ এলেই সুমনের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নিজের ভ্যানটিও আর্জেন্টিনার পতাকা ও রঙে সাজিয়েছেন তিনি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে তার আয়োজন দেখছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ঈশ্বরগঞ্জে বিশ্বকাপ উন্মাদনার অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছেন ‘মেসি সুমন’। তার বাড়িতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন কৌতূহলী মানুষ। এমনকি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ইউটিউব চ্যানেলের প্রতিনিধিরাও সেখানে যাচ্ছেন।বিশ্বকাপকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য, আধুনিক আয়োজন আর তারকাখচিত উৎসবের খবর বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়; কিন্তু ঈশ্বরগঞ্জের এক দরিদ্র ভ্যানচালকের কাছে বিশ্বকাপ মানে অন্যরকম ভালোবাসা, আবেগ আর প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি সীমাহীন টান। অভাবের সংসারে হয়তো অনেক হিসাব মেলেনি, কিন্তু মেসি আর আর্জেন্টিনাকে ঘিরে সুমনের স্বপ্নের কোনো ঘাটতি নেই। বিশ্বকাপের বাঁশি বাজতে এখনও কিছুটা সময় বাকি, অথচ ঈশ্বরগঞ্জের ‘মেসি সুমনের’ ঘরে শুরু হয়ে গেছে ফুটবল উৎসব।


     এই বিভাগের আরো খবর