ঘটনায় চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের বাসিন্দা মোছা. জাহানারা বেগম (৬৬) চুয়াডাঙ্গার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলি আদালত, সদর) আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি সি.আর. নং-৬৯৮/২৬ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।মামলার আসামিরা হলেন জাহানারা বেগমের বড় ছেলে মো. জাব্বারুল হক রবিউল (৪৮), ছোট ছেলে মো. হুমায়ন রশিদ জুয়েল (৪৫) এবং পুত্রবধূ মোছা. কাজল নেহা (৪২) ও খাদিজা খাতুন (৩৯)। তারা সবাই একই গ্রামের বাসিন্দা। জানা গেছে, বড় ছেলে জাব্বারুল হক রবিউল স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।মামলার আরজি সূত্রে জানা যায়, স্বামী মৃত আব্দুস সাত্তার মৃত্যুর আগে স্ত্রীর নামে কিছু জমি লিখে দিয়ে যান। এছাড়া ওয়ারিশ সূত্রেও কিছু জমির মালিক হন জাহানারা বেগম। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই জমিগুলো ছেলেদের নামে লিখে দেওয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। এতে রাজি না হওয়ায় তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২০ মে বিকেল ৪টার দিকে তাকে মারধর করে বাড়ির দোতলার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে ২৪ মে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রায় চার দিন তাকে অবরুদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়। এ সময় তার চলাফেরা, গোসল ও শৌচাগার ব্যবহারের ওপরও নজরদারি করা হয়। প্রয়োজনের তুলনায় অল্প খাবার দেওয়া হতো এবং জমি লিখে না দিলে হত্যা ও গুম করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছেকান্নাজড়িত কণ্ঠে জাহানারা বেগম বলেন, “আমার স্বামী জীবিত অবস্থায় আমার নামে কিছু জমি লিখে দিয়ে গেছেন। সেই জমি ও ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি ছেলেরা নিজেদের দখলে নিয়ে চাষাবাদ করছে। আমি আমার অধিকার চাইলে তারা আমাকে মারধর করে এবং জমি তাদের নামে লিখে দিতে চাপ দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “ছেলে ও পুত্রবধূরা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। পরে কয়েক মাস ভাড়া বাসায় থাকতে হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের মধ্যস্থতায় আবার বাড়িতে ফিরলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ঠিকমতো খেতে দিত না, বাইরে যেতে দিত না, এমনকি ছোট ছেলে আমাকে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। একপর্যায়ে মেয়েকে গোপনে ফোন করে সাহায্য চাই। পরে মেয়ের সহযোগিতায় ভোরে সেখান থেকে বের হয়ে আসি
।প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারটিতে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল। কিছুদিন আগে স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। পরে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর আলম রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, “এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অভিযুক্ত দুই ভাই বৈঠকে উপস্থিত হননি। জাহানারা বেগমের নামে থাকা জমি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. বাবুল হোসেন রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, “জাহানারা বেগমের সঙ্গে তার ছেলেদের জমিজমা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।”
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বড় ছেলে মো. জাব্বারুল হক রবিউল। তিনি রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, “মাকে অবরুদ্ধ রাখা বা মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। পারিবারিক বিষয় সমাধানের জন্য তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি প্রায় দুই সপ্তাহ আমাদের সঙ্গে ছিলেন। পরে নিজেই মেয়ের বাড়িতে চলে যান। কিছু মানুষের প্ররোচনায় আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) কাছে জানতে চাইলে তিনি রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, “আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি এই মুহূর্তে আমার জানা নেই।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. মোসলেম উদ্দিন রেডিও চুয়াডাঙ্গাকে বলেন, “মামলার কপিতে অভিযোগের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। আদালত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।”
আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বাদিনীর জবানবন্দি গ্রহণ করে দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩৪১, ৩৪৩, ৩৮৬, ৩৮৭ ও ৫০৬(২) ধারায় অভিযোগের বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।