ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) কর্মচারীর হাতে খুন হওয়া সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনার মরদেহে অন্তত ২০টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার গলার ডান পাশের নিচের দিকে একটি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ময়নাতদন্ত শেষে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ইমাম হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।ডা. ইমাম হোসাইন জানান, আসমা সাদিয়া রুনার গলায় ধারালো ছুরি বা কোনো ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ওই ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।এতে গলার বড় একটি রক্তনালি কেটে যায় এবং সেখানে প্রচুর রক্ত জমাট বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। রক্তনালি কেটে যাওয়ার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। এটি তার মৃত্যুর প্রধান কারণ।
তিনি আরো বলেন, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।বুকে, পিঠে, পেটে ও হাতে আঘাত রয়েছে। তবে এসব আঘাত গভীর নয় এবং এগুলোর কারণে তার মৃত্যু হয়নি। হামলার সময় নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি এসব আঘাত পেয়ে থাকতে পারেন।
এর আগে বুধবার (৪ মার্চ) বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ দপ্তরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানের হামলার শিকার হন সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা। ঘটনায় অভিযুক্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।এ ঘটনায় এরই মধ্যে চারজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেছেন নিহতের স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি মো. মাসুদ রানা।
মামলায় আসামিরা হলেন— বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমান, সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার, সহকারী অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান এবং সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস।জানা গেছে, শ্যাম সুন্দর সরকার এর আগে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ছিলেন। আর বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস বর্তমানে উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি সমাজকল্যাণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন।মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমান আসমা সাদিয়াকে হত্যা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০১৮ সালে সমাজকল্যাণ বিভাগের তহবিল থেকে অফিস সহায়ক হিসেবে নিয়োগ পান ফজলুর রহমান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হওয়ার পর আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর সরকারের সময়কার আয়-ব্যয়ের হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস তাকে নির্দিষ্ট কাগজে শুধু স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেন। তবে আসমা সাদিয়া বিভাগের অর্থ স্বচ্ছভাবে ব্যয়ের কথা জানালে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।এজাহারে আরো বলা হয়, ফজলুর রহমানসহ কয়েকজন মিলে বিভাগের অর্থ অপব্যবহার করতেন এবং এ বিষয়ে বাধা দেওয়ায় আসমা সাদিয়ার সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। বিভিন্ন সময় ফজলুর রহমান তার সঙ্গে অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারও করেন। একবার সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের উপস্থিতিতেই তিনি আসমাকে অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করেন। এসব বিষয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন রোকসানা মিলিকে মৌখিকভাবে জানান আসমা সাদিয়া। পরে ডিনের নির্দেশে বিভাগে সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও সভাপতিকে অসহযোগিতার অভিযোগে ফজলুর রহমানকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। তবে এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিক্ষক হাবিবুর রহমান এবং ফজলুরকে পুনরায় সমাজকল্যাণ বিভাগে ফেরানোর দাবি জানান।
এ ছাড়া বিভাগের অর্থ তছরুপের অভিযোগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকেও বদলি করা হয়। এর পর থেকেই আসমা সাদিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
আসমা সাদিয়ার জানাজায় উপস্থিত শিক্ষক হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমাকে ঘটনার সঙ্গে কেন জড়ানো হয়েছে, তা আমার জানা নেই। একই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে ফজলুর রহমান সবার কাছেই আসত। সবাইকে বলত তাকে আবারও সমাজকল্যাণ বিভাগে ফিরিয়ে আনতে।’
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ গণমাধ্যমকে জানান, ফজলুর রহমান প্রাথমিকভাবে পুলিশের কাছে লিখিতভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।
ওসি মো. মাসুদ রানা জানান, মামলায় চারজন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের ধরতে ও আইনি পদক্ষেপ নিতে কাজ করছে পুলিশ।