মোঃ রাইসুল ইসলাম রাজু, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা
সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত বৃক্ষরোপণ প্রকল্প বাস্তবায়নে চুয়াডাঙ্গায় নিম্নমানের চারা ও বাঁশের খুঁটি সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। জেলার চার উপজেলায় কৃষক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা উপকরণের মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপকারভোগীরা। একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের মূল্য ও প্রকৃত ক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগও উঠেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলায় ২৫ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে চারা, বাঁশের খুঁটি ও জৈব সার বিতরণ এবং রোপণের কাজ শেষ হয়েছে।
উপকারভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি বাঁশের খুঁটির সরকারি মূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও সরবরাহ করা হয়েছে অপরিপক্ব ও নিম্নমানের বাঁশ, যার বাজারমূল্য ১৫–২০ টাকার বেশি নয়। বিভিন্ন প্রজাতির চারার সরকারি মূল্যও বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি দেখানো হয়েছে বলে দাবি তাদের। অথচ সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার ও বিএডিসি থেকে তুলনামূলক কম দামে চারা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ালগাছি ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শাহ মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন জানান, সরবরাহ করা চারা ও বাঁশের খুঁটির মান এতটাই খারাপ ছিল যে কৃষকরা তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তিনি নিজ উদ্যোগে চারাগুলো গ্রামের রাস্তার পাশে রোপণ করেন। এরই মধ্যে কয়েকটি চারা মারা গেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের ফলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষরোপণ প্রকল্প ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তারা পুরো ক্রয় ও সরবরাহ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ নিম্নমানের চারা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, সরকারি হর্টিকালচার থেকে সরবরাহ করা প্রায় ৮০০টি চারা নিম্নমানের হওয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারের নার্সারি তত্ত্বাবধায়ক আমজাদ হোসেন দাবি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে নির্ধারিত মান বজায় রেখেই চারা সরবরাহ করা হয়েছে এবং নিম্নমানের চারা দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, প্রকল্পের আওতায় রোপণ করা প্রতিটি চারা জিপিআরএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করবে সরকার।
এদিকে জীবননগর উপজেলার একাধিক কৃষকের অভিযোগ, সেখানে চারা বিতরণ করা হলেও বাঁশের খুঁটি দেওয়া হয়নি।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান দাবি করেন, সরকারি নির্দেশনা মেনেই চারা, বাঁশের খুঁটি ও জৈব সার সংগ্রহ করা হয়েছে এবং উপকরণের মান ভালো। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব উপকরণ ক্রয়ে কোনো ওপেন টেন্ডার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, “সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং উপকারভোগীদের মানসম্মত উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।”
জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি নিম্নমানের চারা বা বাঁশের খুঁটি সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হবে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ২৫ হাজার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রতিটি কার্যক্রম জিপিআরএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে উপকারভোগীদের দাবি, শুধু চারা রোপণ নয়—চারার টিকে থাকা, সঠিক পরিচর্যা এবং সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।