শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় সুদের পাওনা টাকা আদায় ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মাত্র ৬ মাস বয়সী এক অবুঝ শিশুকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় অভিযুক্ত আপন চাচি আমেনা বেগমকে আটকের পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিশু জাহিদ রাফসানকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার (১৭ মে) গভীর রাতে র্যাব ও পুলিশের বিশেষ যৌথ অভিযানের মাধ্যমে অপহৃত শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।
অপহৃত শিশু জাহিদ রাফসান জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের হাজী মজিদ বেপারী কান্দি এলাকার মালয়েশিয়া প্রবাসী জুয়েল মল্লিক ও রাত্রি বেগম দম্পতির একমাত্র পুত্রসন্তান।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে প্রবাসী জুয়েল মল্লিকের স্ত্রী রাত্রি বেগম তাঁর জা (স্বামীর ভাইয়ের স্ত্রী) আমেনা বেগমের মধ্যস্থতায় সুদের ওপর ৪ লাখ টাকা ঋণ নেন। রাত্রি বেগমের দাবি, গত বছরই তিনি আসল ও সুদসহ প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সম্পূর্ণ পরিশোধ করে দেন। তবে আমেনা বেগমের দাবি ছিল, তিনি নিজে অন্য উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ করে এই টাকা এনে দিয়েছিলেন এবং এখনো সেখানে বড় অঙ্কের টাকা পাওনা রয়েছে। এই সুদের টাকা ও ঋণের বোঝা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র পারিবারিক কলহ ও মানসিক উত্তেজনা চলছিল।
এরই জের ধরে গত শনিবার (১৬ মে) ভোর ৬টার দিকে চাচি আমেনা বেগম কৌশলে কিছুক্ষণের জন্য খেলার কথা বলে শিশু জাহিদ রাফসানকে নিজের কোলে নেন। এরপরই তিনি শিশুটিকে নিয়ে আচমকা উধাও হয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও শিশুর সন্ধান না পেয়ে পরবর্তীতে রাত্রি বেগম পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানায় একটি নিখোঁজ ও অপহরণের লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
থানায় অভিযোগের পর, আমেনা বেগম মুঠোফোনে জাহিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সুদের দাবি করা ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ হিসেবে পরিশোধ না করলে শিশুকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেন। এরপর রোববার দুপুরে শিশুটির পরিবার কৌশল অবলম্বন করে টাকা পরিশোধের কথা বলে আমেনা বেগমকে ডাকেন। আমেনা বেগম টাকা নিতে ডুবিসাবর বন্দরের কাজীরহাট নতুন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান নেন। তবে চতুর আমেনা শিশুটিকে নিজের সঙ্গে আনেননি। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয় জনতা ও শিশুর স্বজনরা পুলিশকে খবর দেয় এবং আমেনা বেগমকে অবরুদ্ধ করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত আমেনা বেগম নিজের অপরাধ স্বীকার করে বলেন, “আমি নিজে ঋণ করে ওদের টাকা এনে দিয়েছিলাম। মাসে মাসে টাকা শোধ করার কথা থাকলেও ওরা আমার টাকা দেয়নি। বাধ্য হয়েই পাওনা টাকা তুলতে বাচ্চাটিকে নিজের কাছে আটকে রেখেছিলাম।”
এ বিষয়ে শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার রওনক জাহান জানান, “পারিবারিক আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে এমন একটি অমানবিক ও নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ তৎপর ছিল। আটক আমেনা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের পর রোববার গভীর রাতে র্যাব ও পুলিশের একাধিক টিম একটি যৌথ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করে। তবে তদন্তের স্বার্থে উদ্ধারের স্থানটি এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।” অভিযুক্ত আমেনা বেগমের বিরুদ্ধে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।