ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২০ ()
শিরোনাম
Headline Bullet সাদুল্লাপুরে কৃষককে হাতে কলমে শিক্ষা দিচ্ছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাঃ Headline Bullet গাইবান্ধায় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার শিক্ষার্থী হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধনঃ Headline Bullet খোকসা উপজেলায় করোনায় আক্রান্ত একদিনে সর্বোচ্চ ১৫ জন! Headline Bullet রামমন্দির মামলার রায় দেওয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি করোনায় আক্রান্তঃ Headline Bullet মর্ডানা একডোজ করোনা টিকার দাম ৩২/৩৭ডলার করতে চাইঃ Headline Bullet তিন কিশোরী ধর্ষনঃধর্ষকসহ দুইসহযোগী গ্রফতারঃ Headline Bullet বরগুনায় নারী ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ: Headline Bullet গাইবান্ধায় ৭৭ পিচ ইয়াবা সহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার: Headline Bullet মেহেরপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ফলোআপ রিপোর্ট নেগেটিভ: Headline Bullet শেখ কামালের জন্মদিনে মেহেরপুর যুবলীগের আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল:

আজ জাতীয় নেতা কাজী আরেফসহ ৫ নেতার ২১ তম মৃত্যুবার্ষিকী

১৯৯৯ সালে ১৬ ফেব্রয়ারি বিকেল ৪ টার সময় দৌলতপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের তালবাড়িয়া কালিদাসপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সন্ত্রাস বিরোধী জনসভায় বক্তব্য চলাকালিন সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলিতে নির্মম ভাবে আজকের এই দিনে নিহত হন জাতীয় নেতা বীর মক্তিযুদ্ধা সংগঠক, জাতীয় পতাকার রুপকার কাজী আরেফ আহম্মেদসহ ৫ জন। । কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সাধারন সম্পাদক লোকমান হোসেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যন বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড: ইয়াকুব আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা তফসের মন্ডল, সমসের মন্ডল এই ৫ জন জাসদনেতা।

রাজনৈতিক অঙ্গনের কীর্তিমান পুরুষ কাজী আরেফ আহমেদের জন্ম ৮ এপ্রিল ১৯৪২ সালে কুষ্টিয়া জেলার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামে নানা বাড়িতে। তার পৈত্রিক বাড়ি হলো কুষ্টিয়ার মীরপুর উপজেলার খয়েরপুর গ্রামের বিখ্যাত কাজী বাড়ি। বাবা কাজী আবদুল কুদ্দুস আর মা খোদেজা খাতুন। ১০ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। ১৯৪৮ সালে বাবার সঙ্গে সপরিবারে চলে আসেন ঢাকায়। আর তারপর পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী টিকাটুলী এলাকায় বসত গড়েন।

জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইতিহাসকে অনেক চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ সময়টিতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ। ষাটের দশকে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা অসাধারণ মাত্রা পেয়েছিল। আজন্ম এ রাজনীতিক টগবগে যৌবনের দিনগুলোতে ছাত্রলীগ করেছেন। ছাত্র অবস্থায় টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন। সামান্য উপার্জন থেকে সাংগঠনিক কাজেও ব্যয় করতেন। দেশপ্রেমের ব্রত নিয়ে এমন ত্যাগ এই সময়ে তা প্রায় অচিন্তনীয়।

‘কাজী আরেফের মতো নেতা বারবার জন্মায় না। তিনি নেই, রেখে গেছেন তাঁর অসমাপ্ত সংগ্রামী জীবন। তাঁর কাছ থেকে প্রেরণা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দেখানো পথে পথ চলতে হবে আমাদের। কাজী আরেফের প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।’
১৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৯ সালের এদিনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ চলাকালীন সময়ে উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হন বাঙালী জাতিসত্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদ।

কাজী আরেফের মতো নেতা বারবার জন্মায় না। তিনি নেই, রেখে গেছেন তাঁর অসমাপ্ত সংগ্রামী জীবন। তাঁর কাছ থেকে প্রেরণা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দেখানো পথে পথ চলতে হবে আমাদের। কাজী আরেফের প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।
কাজী আরেফের জান্ম ১৯৪২ সালের ৮ এপ্রিল। তিনি ঢাকা কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সালে মেট্রিকুলেশন পাস করেন। স্কুল জীবন থেকেই তাঁর মধ্যে বাঙালী জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনার উন্মেষ ঘটে। ১৯৬০ সাল থেকেই আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তিনি যুক্ত হন। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার আগে তিনি পুরনো ঢাকার স্থানীয় তরুণদের নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলা করেন। এজন্য তিনি তৎকালীন সময়ে পুরনো ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। দেশভাগ হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, বৈষম্যমূলক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, জাতিগত নিপীড়ন প্রভৃতি ঘটনা তাঁকে প্রতিবাদী রাজনীতিতে টেনে আনে।

ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানেই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। সেখান থেকেই তিনি ভূগোল বিষয়ে বিএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিভাগের এমএসসিতে ভর্তি হন। কিন্তু সরকারবিরোধী আন্দোলনের কারণে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।

শুধু রাজনৈতিক কারণে তিনি সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তিনি ছাত্রলীগ করার জন্যেই নিয়মিত টিউশনি করতেন।কখনও হেঁটে, কখনও বাসে চড়ে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সংগঠিত করতেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন বাঙালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একজন নিভৃতচারী বলিষ্ঠ সংগঠক।
১৯৬০ সালে তিনি ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে, সিরাজুল আলম খান ও মরহুম আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিন সদস্যের নিউক্লিয়াস গঠন করেন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন পর পর দুই বার।
এই নিউক্লিয়াস ৬২ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর আস্থাশীল ছাত্রলীগের মাধ্যমে। নিজেকে সব সময় আড়ালে রেখে ছাত্রলীগের সব কর্মকা-ে ও নিউক্লিয়াসকে দেশব্যাপী বিস্তৃত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, জয়বাংলা বাহিনী গঠন, বাংলাদেশের পতাকা নির্ধারণ, মুক্তিযুদ্ধের আগে যে সব স্লোগান জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে তা সবই বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনক্রমে নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে ছাত্রলীগের কর্মকান্ড হিসেবে গৃহীত হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী। কাজী আরেফ আহমেদ মুজিব বাহিনীর অন্যতম একজন রাজনৈতিক প্রশিক্ষক ও মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে ছাত্রলীগের বিভক্তির পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন সময়ে প্রকাশিত দৈনিক গণকণ্ঠের কার্যকরী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জাসদ গঠিত গণবাহিনীর একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শহীদ হলে বাংলাদেশের রাজনীতি ৭১-এর পরাজিত শক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। সেই সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করে ক্ষমতাসীন পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আপসহীনভাবে এগিয়ে যান।
১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে, আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দেশে প্রত্যাবর্তন করলে নেত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রেখে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তিনি বারবার কারাবরণ করেন ও নির্যাতিত হন।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন আন্দোলনে তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়ন ও আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বলার অবকাশ নেই যে, ১৫ দলীয় ঐক্যজোটে শেখ হাসিনার আস্থাভাজন একজন নেতা হিসেবে কাজী আরেফ ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত গণআদালতের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন।

ছাত্র রাজনীতির জীবন থেকে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন ইস্পাতের মতো দৃঢ় ও আপসহীন। সেই সময়ে কাজী আরেফ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ছিল ‘কাজী আরেফ ভাঙ্গেন তো মচকান না’। তিনি ছিলেন সৎ ও সাধারণ জীবনে বিশ্বাসী একজন নির্লোভ মানুষ। বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে এক অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত, মানবিক বাংলাদেশ গঠনে তিনি ছিলেন অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনে হয় আমার নিজের কথা। কাজী আরেফের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণেই আমি ছাত্রলীগের কাউন্সিলে প্রত্যক্ষ ভোটে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম।
এরপর ’৯০-এর গণআন্দোলনে ও ’৯২-এর গণআদালত সফল করতে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলাম। ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে ও একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজী আরিফের মতো নেতার প্রয়োজন ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে।
সাবেক সংসদ সদস্য রওশন জাহান সাথীর (কাজী আরেফের স্ত্রী) উদ্যোগে নিউক্লিয়াসের এক সময়ের তিন তরুণ নেতা কাজী আরেফ আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খানের নামে ‘বাঙালির জাতি রাষ্ট্র’ ২০১৪ সালে একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটি সম্পাদনা করেন স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) আহসান উল্লাহ। এতে কাজী আরেফ আহমেদ লিখে গেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ। ‘জয়বাংলা’ ছিল আমাদের অনুপ্রেরণা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

আমাদের লক্ষ্য ছিল অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের সমগ্র আন্দোলন ও সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নামে’। কাজী আরেফ আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘আমাদের সময়কালে আমরা এ লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারীদের জাতীয় বীর বা বীরত্ব সূচক সম্মান দিতে কৃপণতা দেখাচ্ছি বটে। কিন্তু সে জন্য আগামী প্রজন্মের চোখে শহীদরা ছোট হবেন না, ছোট হবো আমরা’।

কাজী আরেফকে দেশের শত্রুরা আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবে তা ভাবতেও পারিনি। কাজী আরেফ বলতেন, ‘যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন না করা পর্যন্ত আমরা জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকব। তাই অন্য সকল কাজের চেয়ে এ কাজকেই প্রাধান্য দিতে হবে বেশি। তরুণ সমাজ ও নতুন প্রজন্মকে দিয়ে যেতে হবে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন এক বাংলাদেশ। গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও জাতীয় সমৃদ্ধি হবে যার মূল চাবিকাঠি।’
কাজী আরেফদের দেহ নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও আদর্শ বেঁচে থাকবে যুগ যুগ। তাই তিনি সশরীরে না থাকলেও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। কাজী আরেফের দেখা স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই হবে তার প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান।


     এই বিভাগের আরো খবর