ঢাকা, রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ()
শিরোনাম
Headline Bullet রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা পূজা পরিষদের সদস্যদের না জানিয়ে সভা আহবান করায় ক্ষোভ: Headline Bullet রাজবাড়ী জেলা আওয়ামীলী মৎস্যজীবি লীগের ৯৯ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি ঘোষণা: Headline Bullet জাল টাকাসহ আটক ২: Headline Bullet নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন: Headline Bullet ইয়াবাসহ আটক ২: Headline Bullet তথ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, বঙ্গবন্ধুর অবমাননা সহ্য করা হবে না: Headline Bullet গোবিন্দগঞ্জে কলার জমি থেকে চা দোকানীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার: Headline Bullet খোকসা উপজেলাযুবলীগের উদ্দোগে শহীদ শেখ ফজলুল হক মনি’র ৮১তম জন্মবার্ষিকী পালিত: Headline Bullet মেরেপুরে পুরাতন মোটরসাইকেল কেনা বেচার হাটের উদ্বোধন: Headline Bullet মেহেরপুর হরিরামপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি নির্বাচন সম্পূর্ণ:

অসুখ……..ফারহানা chinthia


bbccrimenews :-অবশেষে অনাহুত দিনটি এসেই গেল।গত দুই বছর ধরে ভয়ে ভয়ে দিন কেটেছে।জানতাম নিয়তিকে এড়ানো যায়না তবুও মনের মাঝে একটা ক্ষীণ সলতে যেন আশার পিদিমটাকে এতদিন জ্বালিয়ে রেখেছিল।আমি হাসপাতালে বসে আছি।টুকুনটা গত একঘন্টায় টুকুন থেকে “শবদেহ” হয়ে গেল। এক কোনায় চুপচাপ বসে আছে নীলা,আমার প্রিয়তমা স্ত্রী টুকুনের মাম্মাম। নীলার শূন্য দৃষ্টি দেখে হতাশ লাগছে।একটু পরেই আত্মীয় স্বজনদের আনাগোনা শুরু হবে। আমার স্ত্রী নীলা বেশ অদ্ভুত মেয়ে।নইলে কেউ এযুগে তিনজন বাচ্চা নেয়?আমাদের ছেলেমেদের নাম গুলো ও খুব কাব্যিক।বড়ছেলের নাম সমুদ্র,মেজো জনের নাম অয়ন আর মেয়ের নাম আকাশনীলা। নীলাকে এমন কাব্যিক নাম রাখার কারণ কেউ জিজ্ঞেস করলে হাসিমুখে বলত,” এখন মেয়ের নাম আম্বিয়া খাতুন রাখলে তো সমস্যা।এই নামে কেউ সুন্দর কবিতা লিখতে পারবে না।” প্রশ্নকর্তা চুপ হয়ে যেত।টুকুন সমুদ্রের ডাক নাম। বড় সন্তানদের সঙ্গে বাবামায়ের একটু বাড়তি বন্ধন থাকে বোধ হয়।অন্তত আমার মেজোছেলের সবসময় একটা ধারণা ছিল আমরা টুকুনকে একটু বেশি ভালোবাসি।অয়নের খুব দুঃখ ছিল ভাইয়ার মতন সুন্দর একটা ডাকনাম তার নেই।পিঠাপিঠি হবার কারণে দুজনের সবসময় ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকতো। অথচ সেই অয়ন তার ভাইয়ার অসুখ হবার পর থেকে গায়ে গায়ে লেগে থাকত।ভাইকে সব নতুন খেলনা দিয়ে দিত। মৃত্যুতেও আমাদের সামাজিকতা পালন করতে হয়|নয়তো যাদেরকে আমরা একেবারেই সহ্য করতে পারিনা তারা শোক প্রকাশ করতে এলে ভদ্রতার মুখোশ পরে তাদের সঙ্গে অভিনয় কেন করতে হয়?কি অদ্ভুত তাই না? টুকুনের জন্ম থেকেই সমস্যা ছিল|ওর হার্টের একটা ছিদ্র আছে|জন্ম থেকেই ছিল|আমরা আগে বুঝতে পারিনি|ডাক্তারি ভাষায় এই জটিল রোগের নাম এট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট|যখন ওর পাঁচ বছর বয়স তখন থেকেই জটিলতা শুরু|এর আগেও হয়তো সমস্যা ছিল কিন্তু বাকি দুই ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে গিয়ে আমার বা আমার স্ত্রীর চোখে পড়েনি|আমি সেজন্য আজ অব্দি নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনা| গত বছর ডাক্তার আমাকে জানিয়ে দেন ওর সার্জারি করতে হবে|মধ্যবিত্তের সম্বল ঢাকার একটা ফ্ল্যাট পৈতৃক সূত্রে পেয়েছিলাম|আমার স্ত্রীকে জানিয়ে আমি বিক্রির চেষ্টা করতে থাকলাম|ওই মুহূর্তে আমার বন্ধুরা পাশে এসে দাঁড়াল|ওরাই বুদ্ধি দিল| ওরা সবাই মিলে একটা ফান্ডরাইসিং এর আয়োজন করতে চায়|পুরোনো অনেক বন্ধু হাত বাড়িয়ে দিল| টাকার জোগাড় হয়ে গেছে।আমার এক বন্ধু নামকরা আর্টিস্ট।সে একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করল।ছবি বিক্রির সব টাকা আমার হাতে তুলে দিল।দুঃখ আমাদেরকে যেভাবে কাছে টেনে আনে আনন্দ বোধ করি সেভাবে পারেনা।এককালে আমার সঙ্গে রোশানের একটু দূরত্বই ছিল বলা চলে।আমি ওকে ভাবতাম হামবড়া ভাব ধরা শিল্পী।ওর ও বোধ করি আমার সম্বন্ধে খুব ভালো ধারণা ছিল না। মাদ্রাজে চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাব।পাসপোর্ট নবায়ন করানো শেষ।ভিসার আবেদনপত্র নিয়ে দৌড়া দৌড়ি করছি।এর মাঝে হুট্ করেই একদিন টুকুনের বেশি শরীর খারাপ করল।হাসপাতালে পৌঁছুতে পেরেছিলাম টুকুনকে নিয়ে।কিন্তু আমার মনে সেদিন কেন যেন কু ডেকেছিল। টুকুন বাড়ি থেকে এই শেষবারের মতন যাচ্ছে আমি অনুভব করেছিলাম। ঢাকা শহরে আবাসন সমস্যা যে কত প্রকট তা বোধ করি শেষ কৃত্যের সময় ও বোঝা যায়।কবরস্থানে আমাদেরকে বলল যে কয়েকবছরের বা কয়েকমাসের মাঝে এখানে নতুন কারো কবর হবে।আমি একটু উদাস গলায় বললাম,” ভালোই হবে।টুকুন এমনিতেও রাত্রে একা ঘুমাতে ভয় পায়।” আমার ধারণা ছিল নীলা কবর দেবার সময় উপস্থিত থাকতে চাইবে।এটা নয় ঝামেলা হবে কিনা আমি একটু চিন্তিত ছিলাম।নীলা এমন কোনো আবদার করল না। সব কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরলাম।বাড়ি ভর্তি লোক।ছেলেমেয়েরা নীলাকে ঘিরে রয়েছে।কেউ একজন চা বানিয়ে আনছে।মৃত্যুকে ঘিরেও আমাদের সামাজিকতা আছে।আমি শ্লেষের সঙ্গে ভাবলাম সাধে বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বন।তবে একদিক দিয়ে ভালো হয়েছে নীলার বোধ হয় একটু সঙ্গে প্রয়োজন। একটা জিনিস জানেন মৃত্যুর অপেক্ষায় অনেক অনুভূতি ক্রমশ তার প্রয়োজনীয়তা হারায়। এর মাঝে দেখলাম মেজো আপা আর মেজো দুলাভাই এসেছেন।এই গরমের মধ্যেও উনি থ্রি পিস্ সূট কিভাবে পরে আছেন সেটা একটা রহস্য বটে।এসেই বলতে শুরু করলেন ওনার অফিসে আজকে বিদেশ থেকে বিশেষ অতিথি এসেছে।সব কাজ কর্ম সেরে আসতে দেরি হল। এক কথা দু কথায় নীলা বলল,” চলুন দুলাভাই আপনি বেশ ক্লান্ত বোধ হয়।আমি খাবার দিতে বলি।” নীলা বুদ্ধিমতি মেয়ে।ও নিজে থেকেই খাবার কথা তুলল যাতে করে মেজো আপা দুলাভাই বেশিক্ষন না বসেন। আমিও ভদ্রতা রক্ষা করতে ওনাদের সঙ্গে টেবিলে বসলাম। দুলাভাই প্লেটে খাবার বাড়তে বাড়তে বললেন,” তো কি ভাবলে রাহাত? না মানে আমি বলছিলাম ঐযে টুকুনের চিকিৎসার জন্য যে টাকা উঠেছে ওটার কথা জিজ্ঞেস করছিলাম।” না সব অনুভূতির মৃত্যু হয় নি।এই যেমন এখন সীমা ছাড়ান ক্রোধ বোধ করছি।আমি পাপী তাপি মানুষ তবুও প্রার্থনা করছি যেন এই মুহূর্তে এমন কিছু হয় যাতে এই অপোগণ্ডের সঙ্গে আমার বেশিক্ষন আলাপ না চালাতে হয়।অবাক কথা শুনবেন এই প্রথম আমার দোআ কবুল হল।এই যে এতদিন টুকুনের জন্য জীবন ভিক্ষা চেয়েছি জায়নামাজে বসে তা কিন্তু কবুল হয়নি। দুলাভাইয়ের দাঁতে কাতল মাছের কাঁটা ফুটেছে।দুলাভাই মুখ অবিকল কাতল মাছের মতন হা করে সেই কাঁটা বের করার চেষ্টা করছেন।যাই হোক কিছুক্ষনের মাঝে উনি কাঁটা বের করলেন। পুরোনো আলাপে ফেরত গেলেন কিছুক্ষনের মাঝেই।গলা একটু নামিয়ে বললেন,”আমার কাছে ভাল একটা প্রস্তাব আছে।বসুন্ধরার ওদিকে বেশ সস্তায় একটা ফ্ল্যাট পেয়েছি।জমির কাগজপত্রে একটু ঘাপলা আছে।কিন্তু আমি সব সামলে দেব।তুমি ভেবে চিনতে আমায় জানাও।” আমি এবার একটু গম্ভীর গলায় বললাম,” এখন এসবের কথা বলবার জন্য সঠিক সময় না দুলাভাই।” ” না না সে আমি বুঝতে পারছি।তোমাদের ভাই বোনদের একটু বিষয় বুদ্ধি কম তাই বললাম আর কি?” দুলাভাইয়ের বিষয় বুদ্ধি যে খুব সরেস তা আমাদের চেয়ে ভালো কে না জানে।বাবার মৃত্যুর পরেই উনি সবচেয়ে দামি জমি নিয়ে মার্কেট করার নামে আমাদের বহু বছর ঘুরিয়েছেন।অবৈধ দখলদারের হাতে সব প্রায় চলেই যাচ্ছিল। মেজ আপা একটু বরাবরই বোকাসোকা।কিছুই বোঝেনি।মাথামোটা বোকারা যে জীবনে অনেক সুখী হতে পারে মেজ আপা তার উৎকৃষ্ট প্রমান। সবাই চলে গেছে।এখন বেশ রাত।আমি একা একা বারান্দায় বসে সিগারেট ধরিয়ে চিন্তা করছি টাকাগুলো নিয়ে কি করা যায়।দেখি বারান্দায় মেজ আপা এসে বসেছে। আমার কাছে এসে বসে ইশারায় বললেন সিগারেট ফেলতে হবে না।সেই ছোটবেলার মতন আমি অপার গায়ে হেলান দিয়ে বসলাম। আপা আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন,” বাবু তুই ওই টাকায় খবরদার হাত দিবি না।ওতে টুকুনের স্মৃতি মিশে আছে।কলুষিত করিস না।” আমি বললাম,” তাই আপা?তবে যে শুনি আমার বিষয় বুদ্ধি কম|টাকার অভাবে নিজের ছেলে চোখের সামনে মরে গেল।” আপা কিছু বললেন না আর।যাদের যোগ্যতা থাকে না তাদের বুঝি জোর দিয়ে কথা বলবার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। আমি সকালে উঠে বেশ তাড়াতাড়ি তৈরী হলাম।সঙ্গে চেকবুক নিলাম।নীলা জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবো।ওকে মিথ্যে বললাম যে কবরস্থানে যাব। নীলা বাড়তি কোনো প্রশ্ন করল না।আমার মনে হচ্ছে ওর একটু ডাক ছেড়ে কান্নাকাটি করা দরকার।বুকের ভেতরের মেঘ একটু কমবে। প্রায় আধ ঘন্টা পরে আমি পৌঁছে গেলাম চৌধুরী এন্ড এসোসিয়েটস এর অফিসে। একটা মজার কথা জানেন যেদিন আপনি সত্যিকারে গন্তব্যহীন সেদিন পথে কোনো বাধা পরবে না।টুকুনের এম্বুলেন্স করে যাত্রার দিনেও কিন্তু ট্রাফিক জ্যাম ছিল না। সেক্রেটারিকে পরিচয় দিতেই আমাকে মুহিব চোধুরীর অফিসে নিয়ে গেলেন।উনি বাবার পুরোনো বন্ধু।টাকা পয়সার ব্যাপার সবচেয়ে ভাল বোঝেন। আমার মতন বিষয় বুদ্ধিহীন নির্বোধকে কে আর রাস্তা দেখাবে? ” কেমন আছ? আমি খুব দুঃখিত রাহাত।” ” এই তো চাচা ভাল।” “বল তোমাকে কিভাবে হেল্প করতে পারি।” “আপনার একটু উপকার করতে হবে আমার।একটা একাউন্টের অডিট করবেন আপনি।এপর্যন্ত টুকুনের চিকিৎসা ফান্ডে যে টাকা জমেছে তার হিসাব। আর আমি একটা ট্রাস্ট করতে চাচ্ছি।আপনি ওটার দেখভাল করবেন।আপনার সম্মানী কত জানাবেন।ওটা আমি দিয়ে দেব।” ” তুমি কি আমাকে লজ্জায় ফেলবে? আমি কোনো পয়সা নেবনা তোমার কাছে।” চাচাকে সব বুঝিয়ে বের হতে বেশ দেরি হল।বের হয়ে আমি একবার কবর স্থানে গেলাম।সেখান থেকে বাড়ি।আজকে নীলার পাশে গিয়ে বসব।আমার সব দায়িত্ব শেষ।ওকে একটু জোরে কান্নাকাটির সুযোগ দেব।দুইদিনের সামাজিকতায় শোকের প্রকাশেও যেন বাধা। টুকুনের অসুখের সঙ্গে প্রেম, কাম সব বোধের সঙ্গে আমার বোধ করি একটা অসুখ সেরে গেছে।সেই অসুখের নাম লোভ। সমাপ্ত


     এই বিভাগের আরো খবর